দেশে কোনো না কোনো কাজে যুক্ত থাকার মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করছেন সাত কোটির বেশি মানুষ। এর মধ্যে ৫ শতাংশ যুক্ত আছেন সরকারি চাকরিতে। এখনো কর্মে যুক্ত জনগোষ্ঠীর সিংহভাগ অর্থ উপার্জন করছেন অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত থেকে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) চলতি সপ্তাহে প্রকাশিত শ্রমশক্তি জরিপ-২০২৩ প্রতিবেদনে বেকারদের শিক্ষাগত যোগ্যতাভিত্তিক শ্রেণীবিন্যাসে দেখানো হয়েছে, বেকারদের মধ্যে উচ্চ শিক্ষিতের হারই সবচেয়ে বেশি (১৩ শতাংশ)।
সারা দেশের ১ হাজার ২৮৪টি নমুনা এলাকা থেকে গত বছর ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে তথ্য সংগ্রহ করে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করেছে বিবিএস। ৩০ হাজার ৮১৬টি খানায় এ জরিপকাজ পরিচালিত হয়েছে। এতে দেখা যায়, দেশে এখন ৭ কোটি ৯ লাখ ৮৩ হাজার মানুষ কর্মে নিয়োজিত। এর মধ্যে সরকারি চাকরি করছেন মাত্র ৪ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ। কর্মজীবীদের মধ্যে অধিকাংশই কাজ করছেন যৌথ বিনিয়োগী বা ব্যক্তি খাতের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে, যার হার ৪৭ দশমিক ৯ শতাংশ। বাসাবাড়িতে কাজ করেন ২২ দশমিক ৬ শতাংশ। আর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন সাড়ে ১৭ শতাংশ কর্মজীবী। ৪ শতাংশ কর্মজীবী বিভিন্ন কৃষি ফার্মে যুক্ত রয়েছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশে সরকারি চাকরিজীবীর হার বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় কম। এ খাতে আরো বেশি লোকবল প্রয়োজন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ও আইন-শৃঙ্খলার মতো জায়গায়ও আরো জনবল প্রয়োজন। এজন্য উন্নয়ন পরিকল্পনায় শ্রমঘন বিনিয়োগ বাড়ানো অপরিহার্য। সরকারি অনেক খাতেই জনবল দ্রুত এখনকার চেয়ে দ্বিগুণে তোলা প্রয়োজন। উন্নয়ন পরিকল্পনায় বিষয়গুলোকে যুক্ত করলে কর্মসংস্থানও বাড়বে।
এ বিষয়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের দেশে সরকারি কর্মী বেশি না। বর্তমানের চেয়ে দ্বিগুণ প্রাথমিক শিক্ষক প্রয়োজন। আইন-শৃঙ্খলায় আরো জনবল দরকার। তাছাড়া স্বাস্থ্য খাতে ডাক্তার ও কমিউনিটি পর্যায়ে আরো নার্স প্রয়োজন। আর্থিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় এসব বিষয়ে নজর দিলে কর্মসংস্থানও বাড়বে। তাই সরকারকে শ্রমঘন খাতে বেশি বিনিয়োগ করতে হবে।’
দেশে কর্মজীবীদের বৃহদংশই এখনো অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে যুক্ত বলে বিবিএসের পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে, যার হার ৮৪ শতাংশ। আর প্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করছেন মাত্র ১৬ শতাংশ। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের অধিকাংশই নারী। নারীদের ৯৫ দশমিক ৭ শতাংশই এ খাতে যুক্ত। আর পুরুষ কর্মীদের প্রায় ৭৮ শতাংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক বরকত-ই-খুদা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দীর্ঘ সময় ধরেই এটা ৮০ শতাংশের ওপরে রয়েছে। এটি কমিয়ে আনতে বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন।’
কর্মজীবীদের শিক্ষাগত যোগ্যতাভিত্তিক বিভাজনে দেখা গেছে, এর মধ্যে মাধ্যমিক পাস করারাই সবচেয়ে বেশি, যাদের হার প্রায় ৩৬ শতাংশ। এর পরের অবস্থানে রয়েছে প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোনো লোকজন, যার হার ২৭ শতাংশ। কোনো ধরনের শিক্ষাগত যোগ্যতা ছাড়াই কাজ করছেন ১৯ শতাংশ কর্মজীবী। আর উচ্চ মাধ্যমিক পাস করা ৮ শতাংশ এবং একই হারে স্নাতক পাস করা লোকজন কাজে যুক্ত রয়েছেন।
শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে এখন বেকারত্বের হার ৩ দশমিক ৩৫ শতাংশ। এ বেকার জনগোষ্ঠীর মধ্যে উচ্চ শিক্ষিতদের হার সর্বোচ্চ। বেকারদের ১৩ শতাংশ স্নাতক পাস। আর ৬ দশমিক ৬৯ শতাংশ উচ্চ মাধ্যমিক পাস। মাধ্যমিক পাস করেও বেকার আছেন, এমন জনগোষ্ঠী মাত্র ২ দশমিক ৫৮ শতাংশ। বেকারদের মধ্যে মাত্র ১ দশমিক ৬৬ শতাংশ প্রাথমিক পাস করেছেন।
সংজ্ঞাগত কারণে শিক্ষিতদের মধ্যে বেকরত্ব বেশি দেখা যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে অধ্যাপক মনজুর আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সপ্তাহে কয়েক ঘণ্টা কাজ করলেই কাউকে কর্মজীবী দেখানো হচ্ছে। কিন্তু অল্প আয় দিয়ে অনেক নিম্ন আয়ের মানুষের হয়তো জীবন চলছে না। তবু অল্প কাজ করলেও তারা পেশাজীবী হয়ে যাচ্ছেন। আবার শিক্ষিত মানুষ হয়তাে ছোট কাজ না করে চাকরির জন্য অপেক্ষা করছেন। তাই তাদের মধ্যে বেকারত্ব বেশি দেখা যায়। কিন্তু আমাদের দেশে তরুণদের মধ্যে এ হার অন্য দেশের তুলনায় বেশি। সেজন্য শ্রমবাজারের চাহিদামতো মানসম্মত শিক্ষার অভাবও একটি বড় কারণ।’
পরিসংখ্যানমতে, ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে বেকার থাকার সময় বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এক-দুই বছর পর্যন্ত বেকার থাকছেন ১১ শতাংশ তরুণ। আর দুই বছরের বেশি সময় ধরে বেকার থাকছেন প্রায় ৮ শতাংশ। যেখানে ৬-১২ মাস পর্যন্ত বেকার থাকা তরুণের হার ১৭ দশমিক ২৩ শতাংশ।
বাংলাদেশী শ্রমজীবীদের মধ্যে এখন গড় বেতন ১৩ হাজার ৮৬৫ টাকা। এর মধ্যে পুরুষ কর্মীদের বেতন ১৪ হাজার ৪৮৯ আর নারী কর্মীরা গড় বেতন পান ১০ হাজার ৮৩১ টাকা। খাতভিত্তিক হিসেবে সবচেয়ে বেশি বেতন সেবা খাতে, গড়ে ১৫ হাজার ৭১০ টাকা। এর পরেই রয়েছে শিল্প খাত, গড় বেতন ১৩ হাজার ৭৬০ টাকা। সবচেয়ে কম বেতন কৃষি খাতে। গড়ে মাসে ৮ হাজার ৯৩৮ টাকা।
পেশাভিত্তিক হিসেবে সবচেয়ে বেশি বেতন পান ম্যানেজাররা। মাসে গড়ে ৩৩ হাজার ৮৬৮ টাকা। শহরাঞ্চলে কর্মরতদের গড় বেতন ১৫ হাজার ৯০৩ টাকা। আর গ্রামে কর্মরতদের গড় বেতন ১২ হাজার ৫৬৬ টাকা। প্রাথমিক পর্যায়ে কর্মরতদের গড় বেতন সবচেয়ে কম, মাসে ৯ হাজার ৩০১ টাকা। সময়ের দিক দিয়ে কর্মে নিয়োজিত কর্মীরা সপ্তাহে গড়ে ৪৭ ঘণ্টা কাজে যুক্ত থাকেন। শহরে কর্মঘণ্টা সপ্তাহে ৫১ ঘণ্টা আর গ্রামে ৪৫ ঘণ্টা।